নিজস্ব প্রতিবেদক, ত্রিশাল: ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার মঠবাড়ী ইউনিয়ন ভূমি অফিস এখন সাধারণ মানুষের জন্য এক আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছে। সরকারি নিয়মে ডিজিটাল পদ্ধতিতে নামজারি হওয়ার কথা থাকলেও, বাস্তবে এখানে চলছে প্রকাশ্য ঘুষ বাণিজ্য। ইউনিয়ন সহকারী ভূমি কর্মকর্তা (নায়েব) কামরুজ্জামান সেলিমের বিরুদ্ধে উঠেছে দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ।
দালাল ছাড়া অচল ফাইল
অভিযোগ রয়েছে, অনলাইনে আবেদন করার পরও দালালের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের টাকা না দিলে কোনো ফাইলে হাত দেওয়া হয় না। প্রতিটি ফাইলে দালালের সঙ্গে পূর্ব চুক্তির বিশেষ ‘সাংকেতিক চিহ্ন’ থাকলে তবেই সেটি অনুমোদনের পথে এগোয়। অন্যথায় তুচ্ছ অজুহাতে বাতিল করা হয় বৈধ আবেদন।
‘ছায়া নায়েব’ হাফিজুলের সিন্ডিকেট
অফিসে কোনো সরকারি নিয়োগ ছাড়াই হাফিজুল নামের এক যুবককে ‘ছায়া নায়েব’ হিসেবে বসানো হয়েছে বলে অভিযোগ। স্থানীয় আব্দুল খালেকের ছেলে এই হাফিজুলই মূলত ঘুষ লেনদেন নিয়ন্ত্রণ করে। অভিযোগ অনুযায়ী—
প্রতি খারিজে আদায় ১০-২০ হাজার টাকা
জটিল মামলায় ৩০-৫০ হাজার টাকা
সরকারি ১১৭০ টাকার ফি বহুগুণ বাড়িয়ে আদায়
অফিসে ব্যক্তিগত টিম, অনলাইন জালিয়াতির অভিযোগ
ভুক্তভোগীরা জানান, নায়েব সেলিম যেখানে যান, সেখানেই একটি নির্দিষ্ট টিম নিয়ে যান। তার আত্মীয় (শালা) ও একজন দক্ষ কম্পিউটার অপারেটর সবসময় অফিসে অবস্থান করে, যাদের মাধ্যমে অনলাইন ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে—যা সম্পূর্ণ বেআইনি।
অস্বাভাবিক সম্পদ নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগ রয়েছে, এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ উপার্জন করা হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, আকুয়া গরুর খোয়াড় মোড়ের বিস্কুট ফ্যাক্টরি রোড এলাকায় সাড়ে পাঁচ শতাংশ জমির ওপর নির্মিত বহুতল ভবনটি নায়েব সেলিমের।
জানা গেছে—
জমির মূল্য প্রতি শতাংশ প্রায় ২৫ লাখ টাকা
ছয়তলা ফাউন্ডেশনের ওপর তিনতলা ভবন নির্মিত
তিন/চার ইউনিটের আধুনিক বাসা
স্থানীয়দের ভাষ্য, “ওই এলাকায় তার বাড়ি কোনটা জিজ্ঞেস করলেই সবাই দেখিয়ে দেয়।”
খাজনা জালিয়াতি ও হয়রানির অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, ইচ্ছাকৃতভাবে খাজনার পরিমাণ বাড়িয়ে নোটিশ দেওয়া হয়, পরে ঘুষের বিনিময়ে তা কমিয়ে দেওয়া হয়। এতে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে, আর সাধারণ মানুষ পড়ছে চরম ভোগান্তিতে।
অফিস সময়ের পর ‘গোপন কার্যক্রম’
সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে অফিস সময়ের পরও গভীর রাত পর্যন্ত অফিস খোলা রাখার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের মতে, এই সময়েই মূলত ঘুষের টাকা ভাগ-বাটোয়ারা ও ফাইল নিষ্পত্তির গোপন কার্যক্রম চলে।
ভুক্তভোগীর আর্তনাদ
এক ভুক্তভোগী বলেন,
“সঠিক কাগজপত্র থাকার পরও টাকা ছাড়া নামজারি করতে পারছি না। নায়েবের কাছে গেলে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। আমরা নিজেদের জমিতেই জিম্মি হয়ে গেছি।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে কামরুজ্জামান সেলিমের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে আর তাকে পাওয়া যায়নি। স্থানীয় জনগণের দাবি, এ ধরনের দুর্নীতিবাজ কর্মকাণ্ড সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছে। দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে অপসারণের দাবি জানিয়েছেন মঠবাড়ী ইউনিয়নের বাসিন্দারা।